আপনারা যারা জামায়াত-শিবির করেন!
পাকিস্তানে শিয়া মসজিদে আবারও আত্মঘাতী বোমা হামলা হয়েছে। পাকিস্তানে এটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার; প্রতিদিনই ইসলাম কায়েমের নামে মুসলমানদেরই হত্যা করা হচ্ছে। বাংলাদেশে চলছে অরাজকতা সৃষ্টির অবিরত চেষ্টা। অনেক প্রাণ গেছে। এই দুই দেশের উগ্রবাদীদের উৎস-আদর্শ এক এবং অভিন্ন। এরা ধর্মকে কেন্দ্র করে রাজনীতি করে। পাকিস্তানে আত্মঘাতী হামলায় কিংবা বাংলাদেশে নাশকতা সৃষ্টির সময় মৃত্যুবরণকারী শহীদ খেতাবও পেয়ে যায়। জামায়াতে ইসলামীর ওয়েবসাইটে গেলেই শহীদদের নাম দেখা যায়। ধর্ম খুবই স্পর্শকাতর বিষয়। এ ধর্ম দিয়ে এমনভাবে নেতা-কর্মীদের ব্রেইন প্রোগ্রাম করা হয় যে শহীদের মর্যাদার কাছে নিজের প্রাণ অতি তুচ্ছ। সম্প্রতি জামায়াতের খুলনা জেলার আমীর প্রকাশ্যেই ঘোষণা দিয়েছে তারা কোরআন-হাদিস পড়েছে, জীবন দিতে তারা প্রস্তুত। কিন্তু প্রশ্ন হলো কিসের মাপকাঠিতে শহীদ খেতাব নির্ধারিত হচ্ছে! যে ধর্ম নিয়ে তারা রাজনীতি করে তার মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে তারা অবগত নয় এটা ভাবতে অবাক লাগে!
জামায়াত-শিবির কি ইসলামের অনুসারী?
ইসলাম কখনোই অশান্তি বা অরাজকতাকে অনুমোদন দেয় না। মানুষের সামান্যতম ক্ষতি করা যাবে না এটা সুপ্রিম কমান্ডমেন্টসের একটি। এমন কি পশুপাখি-গাছপালার ক্ষতিসাধন না করারও নির্দেশ রয়েছে। মোস্ট হিস্টরিক্যাল রিলিজিয়াস পারসন খ্যাত হযরত মুহাম্মদ (স:) এর সমগ্র জীবনটি খোলা গ্রন্থের মত। তাঁর জীবনের প্রতিটি পাতায় পাতায় শান্তি, সহমর্মিতা, উদারতা, সহিষ্ণুতা ও ক্ষমাশীলতার সাক্ষ্য রয়েছে। যার অনুসারী হিসেবে দাবি করে তারা অপতৎপরতা চালায় সেই হযরত মুহাম্মদ (স:) এর কোন নির্দেশনা তারা পালন করছে? তাঁর চরিত্রের কোন গুণটি তারা নিজেদের মধ্যে প্রতিফলন ঘটিয়েছে? ইসলাম শব্দটির মানে যে শান্তি – তারা কি কোনভাবে কার্যত তা প্রমাণ করতে পেরেছে! সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে রাজত্ব প্রতিষ্ঠার নীতির সাথে তাদের পার্থক্য কোথায়?
নাশকতা, বা সশস্ত্র পথে মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করা যায় না
এ পৃথিবীতে ক্ষমতা দখলের পালা চলছে যুগ যুগ ধরে। ইসলামের বার্তাবাহক হযরত মুহাম্মদ (স:) এর চরিত্রে উদারতার বদলে যদি উগ্রতা বা প্রতিশোধ-পরায়ন মনোভাব থাকতো, সশস্ত্র বিপ্লব যদি হাতিয়ার হতো, তবে ইতিহাসে বড়জোর আরবের রাষ্ট্রপ্রধান/বাদশাহ হিসেবেই স্থান হতো; ধর্মবিশ্বাস প্রতিষ্ঠা সম্ভব হতো না। মনে রাখা প্রয়োজন ইসলাম প্রচার বন্ধ করার বিনিময়ে তৎকালীন গোত্রপ্রধানরা তাঁকে রাজত্ব, সম্পদ এবং পার্থিব সবকিছু দেয়ার প্রলোভন দিয়েছিল কিন্তু তিনি রাজনৈতিক/পার্থিব লোভ ত্যাগ করে বেছে নিয়েছিলেন এক দু:সাধ্য পরিক্রমা।
কোন মতাদর্শই শক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। ইসলামী জীবন বিধানে যখনই রাজনীতি ও ক্ষমতা-লিপ্সা এসেছে তখনই বিপর্যয় এসেছে। যে উমরের ন্যায়বিচার বিশ্বখ্যাত, ইসলাম প্রতিষ্ঠায় অসামান্য ভূমিকা পালনকারী আলী (রা:) – চার খলিফার তিনজনকে হত্যা করা হয়েছে। মহানবীর (স:) পরম স্নেহভাজন হাসান-হোসেনের কারবালার আর্তনাদ কি এখনও শোনা যায় না! কারা এসব হত্যাকারী! বিরোধিতাকারীরা কারা? ইসলাম প্রচারের শৈশবকালে যে উসমান (রা:) মুসলমানদের জন্য ১৬ হাজার দিরহাম খরচ করে পানির ব্যবস্থা করেছিলেন, ইসলামের যে কোন কাজে প্রথম যিনি অর্থ দান করতেন, সেই উসমানের গৃহ চল্লিশ দিন ঘেরাও করে পান করার পানি পর্যন্ত দেয়া হয়নি। কোরআন তেলাওয়াতকালে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এরা কারা? দু:খজনক হলেও সত্যি যে এ বিদ্রোহকারীরাও মুসলমান ছিল। পৃথিবীর অর্ধেক রাজত্ব শাসন করার পর বিপর্যয়কালে স্পেনে আজান দেয়ার কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি এটিও সত্য! এ বিপর্যয়ের কারণ ছিল রাজনীতি ও ক্ষমতা-লিপ্সা। ইসলামের বিকাশ হয়েছে স-মহিমায়। এটি কোরআনেরই নির্দেশ পথভ্রষ্ট হলে ধ্বংস অনিবার্য, ইসলামের ঝাণ্ডা ধরবে অন্যরা।
উদ্দেশ্য রাজনৈতিক এবং হীন, মোটেও ধর্মীয় নয়
ইসলামে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি, জোরজবরদস্তি না করা, অন্য ধর্মের অনুসারীদের উপাস্য নিয়ে কটূক্তি না করা এগুলো কোরআনের নির্দেশ। কোরআনেই বলা হয়েছে, যুদ্ধ অপেক্ষা শান্তি উত্তম, একজন নিরপরাধকে হত্যা করা গোটা মানবজাতিকে হত্যার শামিল। শান্তি-শৃঙ্খলাকে গুরুত্ব দিয়ে এ ধরণের অনেক বাণী রয়েছে:
“And among people there is also someone whose conversation seems to you pleasing in the life of the world and who calls Allah to witness that which is in his heart, but in truth he is most quarrelsome. And when he turns away (from you), he runs about in the land to do (everything possible) to rouse mischief and destroy crops and life. And Allah does not like mischief and violence. And when it is said to him (on account of this tyranny and violence): ‘Fear Allah,’ his arrogance stimulates him for more sins. Hell is, therefore, sufficient for him. And that is indeed an evil abode.”
(Al-Qur’an, 2:204-206)
দেশে অশান্তি সৃষ্টি সম্পর্কে বলা হয়েছে:
“When it is said to them: ‘Do not spread disorder in the land,’ they say: ‘It is we who reform.’ Beware! (Truly) it is they who spread disorder, but they do not have any sense (of it) at all.”
(Al-Qur’an, 2:11-12)
বহু হাদিসে বর্ণিত আছে, কোন মুসলমানের ক্ষতি করলে সে আমাদের দলভুক্ত নয়, কোন নিরপরাধ অমুসলিমের অনিষ্ট করলে নবী(স:) কেয়ামতের দিন সেই অমুসলিমের পক্ষ নিবেন, নির্যাতনকারী মুসলমানের বিরুদ্ধে।
আল্লাহ যাদের হেদায়েত দান করতে চান না তাদের হৃদয়ে সীলমোহর এঁটে দেন।
জামায়াত-শিবির কাদের অনুসারী?
পৃথিবীতে ইসলামী অনুশাসন চলে আসছে নিয়মতান্ত্রিকভাবে, কখনোই তা শাসনতান্ত্রিকভাবে নয়। এর অন্যতম কারণ ইসলামের দর্শন জাতীয়তাবাদ বিরোধী। সমগ্র মুসলমানগণ একটি উম্মাহ হিসেবে পরিগণিত হয়। তাই ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন-বিধান হিসেবে কোরআন-হাদিসের নির্দেশনা এবং ক্ষেত্র-বিশেষে আলেমদের ফতোয়ার ভিত্তিতে পরিচালিত। আত্মঘাতী হামলা, নাশকতা বা উগ্রবাদের পক্ষে বিশ্বের কোন প্রতিষ্ঠিত/শীর্ষ আলেম/ফকিহ ফতোয়া দেননি। শুধুমাত্র ফিলিস্তিনের ব্যাপারে বিভক্ত রায় রয়েছে। তবে ফিলিস্তিনের ইস্যুটি ধর্মীয় নয়, মানবিক, রাজনৈতিক একই সাথে নৈতিক। জামায়াত শিবিরের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
- ১. মুসলমানদের মধ্যে একটি পৃথক দল তৈরি করেছে। যেহেতু ধর্মই মুলবাণী তাই ফেতনা সৃষ্টি বললে ভুল হবে না।
- ২. তাদের গুরু মওদুদী মহানবী (স:) সহ অনেক নবীকে নিয়ে, ইসলাম নিয়ে মনগড়া মন্তব্য করেছে যার কয়েকটি অবমাননার পর্যায়ে পড়ে এবং ইসলাম-বিরুদ্ধ।
- ৩. দলভুক্তদের জন্য বিশেষ প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়েছে যেখানে শুধুমাত্র ঐ মতাদর্শের লোকেরাই পুনর্বাসিত হয়। তাদের আর্থিক সকল সুযোগ-সুবিধা, দান-খয়রাতও দলকেন্দ্রিক যা ইসলামের মর্মবাণীর সাথে সংঘাতপূর্ণ।
- ৪. মানুষ মাত্রই ভুল করে থাকে। খলিফার ভুল হলেও সংশোধন বা ক্ষমা প্রার্থনার দৃষ্টান্ত রয়েছে কিন্তু গণহত্যা, খুন, ধর্ষণ, লুটপাটের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও জামায়াত নেতাদের মর্যাদা নেতাকর্মীদের কাছে যেন নবীতুল্য!
- ৫. স্বাধীনতার সাত বছর পর প্রকাশ্যে রাজনীতি শুরু করার পর থেকে জামায়াত শিবিরের হামলা ও আক্রমণের শিকার হয়েছে মুসলমানরা এবং অমানবিক নির্যাতন চালিয়েছে সংখ্যালঘুদের উপর।
- ৬. তাদের মতের বিরোধিতা করলেই যাকে তাকে কাফের-মুরতাদ-নাস্তিক খেতাব দেয়া হয়। তারা আস্তিকতা নির্ধারণ করে তাদের নেতাদের উপর বিশ্বাস স্থাপনের উপর ভিত্তি করে।
- ৭. উগ্রবাদ, সশস্ত্র বিপ্লব ও জঙ্গিবাদের প্রকাশ্য সমর্থনদাতা।
এর কোনটিই ইসলামের মূল-চেতনা বা মর্মবাণীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ছাড়াও মিথ্যা বলা, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, সত্য গোপন, অপপ্রচার, কুৎসা রটনা বা গীবত হেন কাজ নেই যা তারা করে না। তাই বলার অপেক্ষা রাখে না যে তারা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত এবং ইসলামের কথা বললেও তাদের কার্যকলাপ সর্বহারাদের সমতুল্য।
জামায়াত শিবিরের নেতাকর্মীদের বলতে চাই: যদি সত্যিকার অর্থে আপনারা ইসলামের অনুসারী হতেন তবে কখনো কোন স্বার্থের বিনিময়ে আপোষ করতেন না। আপনারা তখন ধর্মের কথা বলেন যখন তা পক্ষে হয়। আল্লাহ বলেছেন তিনি দ্বীনকে সহজ করেছেন। আপনারা কঠিন করছেন কেন? আল্লাহ আপনার আমলনামা দেখবেন, আপনাদের নেতারা দোষী কি-না তা জিজ্ঞেস করা হবে না। আপনারা কাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন? ইসলামে বিভক্তি নিষিদ্ধ। এমন কি কোরআনে মহানবী (স:) কে বলা হয়েছে – হে মুহাম্মদ বিভক্তির ক্ষেত্রে আপনার কিছু করণীয় নেই, আল্লাহ বিচার করবেন। মুহাম্মদ (স:) এর সময় তো বিভক্তি ছিল না। এটি বলা হয়েছে আমাদের উদ্দেশ্যে এবং বিভক্ত না হওয়ার গুরুত্ব বোঝাতে হযরত মুহাম্মদ (স:) কে বলা হয়েছে। যেটি মহানবীকে নিষেধ করা হয়েছে তা করার এখতিয়ার আপনারা কোথায় পেলেন? আপনাদের জানার কথা বহু বছরের ইবাদতও বৃথা যায় এমন দৃষ্টান্ত আছে। একটি হাদিসে উল্লেখ আছে একজন পতিতা একটি কুকুরের প্রতি দয়াশীল হয়ে পানি পান করানোর বদলে সকল গুনাহ থেকে মুক্তি পেয়েছে। ইসলামের নামে অশান্তি সৃষ্টিতে ধর্ম আপনাদের পার্থিবতার হাতিয়ার মাত্র।
“It is those whose entire struggle is wasted in worldly life, but they presume they are doing very good works.”
(Al-Qur’an, 18:104)
মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যার “তোমরা যারা শিবির কর” শিরোনামে একটি লেখা লিখেছিলেন। মানবিক আবেদন নিয়ে তিনি লিখেছিলেন। তাই শিরোনামটি ধার নিলাম।



