Sat. May 28th, 2022

আবদুল্লাহ হারুণ
স্বাধীনতার প্রাক্কালে ১৪ ডিসেম্বর যেভাবে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছিল, ঠিক একই উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট চালানো হয়েছিল ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা। এই বর্বরোচিত হামলার হোতা কারা তা অনেকের কাছেই ওপেন সিক্রেট। বিচারে কি হবে জানি না, তবে এ হামলাকেন্দ্রিক বিষয়গুলো সম্পর্কে অনেকেই অবগত। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনীতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার যে সুশীল ট্র্যাডিশন রয়েছে সে কারণে হয়ত নেপথ্যের ঘটনা জানা সত্ত্বেও অনেক সংবাদ মাধ্যম তা এড়িয়ে যায়। কিন্তু বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ উপস্থাপনের স্বার্থে এবং সুষ্ঠু রাজনীতির স্বার্থে এমন অপরাজনীতি ও ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন এ দৃশ্যপটের পর্দা উন্মোচন।

বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের অনানুষ্ঠানিক সূচনা হয় মূলত ১৯৯৩ সালে আফগানিস্তানে তালেবানী শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকে। পরবর্তী সময়ে এর প্রভাব পড়ে সারা বিশ্বে। আফগানিস্তানে আইএসআইয়ের কর্তৃত্বের নেপথ্যে রয়েছে বিস্তীর্ণ মরু এলাকাজুড়ে বিলিয়ন ডলারের পপি ব্যবসা। সন্ত্রাসবাদ পর্যবেক্ষকদের তথ্য অনুসারে এ মাদক বাণিজ্যের মূল্যমান বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের মতো দেশের বার্ষিক বাজেটের চেয়েও বেশি। এই বিপুল অঙ্কের অর্থের বড় অংশ ব্যয় হয় বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠন পরিচালনা ও অস্ত্র কেনায়। আর এ উপমহাদেশে জঙ্গীবাদের প্রধান সহায়তাকারী ও মদদদাতার ভূমিকা পালন করে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই।

বাংলাদেশের জঙ্গী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ও ইসলামিক জঙ্গী দলগুলো। পাকিস্তান থেকে ভারতে যে অস্ত্রের চালান যেত তার রুট ছিল বাংলাদেশ। ২০১০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকার দুই শতাধিক জঙ্গী ঘাঁটিসহ সারাদেশে প্রায় তিন শ’ জঙ্গী ঘাঁটি ও প্রশিক্ষণ শিবির ছিল। দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার কথা আমরা জানি, যা জাহাজ বোঝাই করে আনা হয়েছিল। এসব অস্ত্র অন্তত দশটি রুটে বাংলাদেশ হয়ে ভারতে পাচার করা হতো।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনা

জবাবদিহিহীন আমানত রাখা, অর্থ পাচার ও লেনদেনের সহজ এবং নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিশ্বে সুইজ ব্যাংকের পরই সিঙ্গাপুরের ব্যাংকগুলোর স্থান। বিশেষত এ উপমহাদেশের কালো টাকার মালিকদের পছন্দ সিঙ্গাপুর। আইএসআই, জঙ্গীগোষ্ঠী ও দুবাইকেন্দ্রিক ভারতীয় ডনরা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্যও সিঙ্গাপুরকেই বেছে নেন। ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারি ও জুন মাসে সিঙ্গাপুরে দাউদ ইব্রাহিম এবং আইএসআইয়ের সঙ্গে তারেক রহমানের অনুষ্ঠিত বৈঠকে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনা হয় বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়। ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও জঙ্গীগোষ্ঠীকে সহায়তা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনাকে মূল বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন তারেক রহমান। আর এর পরিপ্রেক্ষিতেই ২১ আগস্ট হামলার পরিকল্পনা করা হয়।

জিয়া পরিবার অর্থ পাচার ও পাচারকৃত অর্থ বিনিয়োগের জন্য দুটি কনসোর্টিয়াম গঠন করেছিল। একটি থাইল্যান্ডকেন্দ্রিক তারেক রহমানের মালিকানাধীন। এ কনসোর্টিয়ামের অন্যতম সদস্য ছিল থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা। তারেক রহমানের থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও দুবাইয়ে বিনিয়োগ এবং অর্থসম্পদ গড়ে তোলার হাব হিসেবে ব্যবহার হয় সিঙ্গাপুর। এ পরিবারের অপর কনসোর্টিয়ামের নাম তঅঝত (জাফিয়া, আরাফাত, শর্মিলা, জাহিয়ার নামানুসারে) কনসোর্টিয়াম। আরাফাত রহমান কোকোর মালিকানাধীন এ কনসোর্টিয়াম ২৪টি কোম্পানির সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল, যার একটি দাউদ ইব্রাহিমের ডি কোম্পানি। তঅঝত কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমেই সিলেট ও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার অর্থ লেনদেন হয়।

অস্ত্র চোরাচালান, জঙ্গীবাদ ও হামলা

বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে রাষ্ট্রযন্ত্রকে পুরোপুরি ব্যবহার করা হয়েছিল আইএসআইয়ের সক্রিয় সহযোগী হিসেবে। দল, প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় সদস্য এ সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে ভূমিকা পালন করে। আইএসআইয়ের অস্ত্র চোরাচালান চক্রের অন্যতম সদস্য ছিলেন পাকিস্তানী জঙ্গী ইউসুফ ভাট ও মাওলানা তায়জউদ্দীন। ২০০৩ সালে দাউদ ইব্রাহিম ও সোনা চোরাকারবারি আব্দুর রহমান ইয়াকুবের এআরওয়াই টিভি বাংলাদেশে শুধু অস্ত্র পাচারের জন্য ‘এআরওয়াই বাংলা’ নামে একটি টিভি চ্যানেল করার উদ্যোগ নিয়েছিল। তৎকালীন এনএসআইয়ের ডিজি আব্দুর রহীমের স্ত্রী উক্ত চ্যানেলের চেয়ারম্যান হওয়ার কথা ছিল।

২১ আগস্ট হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করে হারিছ চৌধুরী, লুৎফুজ্জামান বাবর ও জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী। তাদের পরামর্শক্রমে বিএনপি নেতা আবদুস সালাম পিন্টু তার ভাই মাওলানা তায়জউদ্দীনকে পাচারকৃত গ্রেনেড থেকে নিজেদের ব্যবহারের জন্য কিছু গ্রেনেড রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। নির্দেশ মোতাবেক পাকিস্তান থেকে কলকাতার জঙ্গী গ্রুপ আসিফ রেজা কমান্ডো কোম্পানির জন্য আনা ৮ প্যাকেট আর্জেস-৮৪ গ্রেনেড থেকে দুটি প্যাকেট রেখে দেয়া হয় বাংলাদেশে ব্যবহারের জন্য। প্রতি প্যাকেটে গ্রেনেড থাকে ২৪টি। তৎকালে উলফা ও আসিফ রেজা কোম্পানির মাধ্যমে ইন্ডিয়ান মুজাহিদীন, লস্করে তৈয়বাসহ বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠনে কাছে পাকিস্তান থেকে আনা অস্ত্র সরবরাহ করা হতো।

২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশে দুটি জঙ্গীগোষ্ঠীর উত্থান হয়। একটি হচ্ছে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক হরকাতউল জিহাদ (হুজি), যার নেতৃত্বে ছিল আফগান ফেরত কয়েকযোদ্ধা। অপরটি মধ্যপ্রাচ্যপন্থী জেএমবি। উভয় দলের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব থাকলেও আইএসআইয়ের কারণে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করে জামায়াত। শিবিরের সাবেক ক্যাডাররা যুক্ত হয়েছিল এসব দলে।

পরিকল্পনা বাস্তবায়ন

মাঠ পর্যায়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অন্যতম ভূমিকা পালন করে বিএনপি নেতা আবদুস সালাম পিন্টু ও তার ভাই মাওলানা তায়জউদ্দীন। প্রাথমিকভাবে তায়জউদ্দীন হরকাতউল জিহাদকে পরিকল্পনায় সম্পৃক্ত করে। পরবর্তী সময়ে তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, বাবর, নিজামীসহ সংশ্লিষ্টদের বৈঠক হয়। হামলা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয় হুজির রাজশাহী জেলার প্রধান মুফতি হান্নানকে। এ হামলা বাস্তবায়ন হলে হুজিকে রাজনীতিতে আসার সুযোগ দেয়া হবে এই মর্মে হুজির আমির আবদুস সালামকে প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়েছিল। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে, বিশ্বে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে পরিচিত এই হুজি তৎকালে নির্বাচন কমিশনে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছিল।

২১ আগস্ট হামলার টেস্ট কেস হিসেবে হামলা করা হয়েছিল সিলেট মাজারে তৎকালীন ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত আনোয়ার চৌধুরীর ওপর। এ হামলার উদ্দেশ্য ছিল সকল হামলাকে জঙ্গী কর্মকাণ্ড হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে উপস্থাপন করা।

তারেক রহমানের পাকিস্তান সফরের গুঞ্জন

বিভিন্ন সূত্রের প্রাপ্ত তথ্যে ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারি ও জুন মাসে তারেক রহমান সিঙ্গাপুরে বসে হামলার পরিকল্পনা করেন বলে জানা গেলেও ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে তারেক বিজি-০০৭ বিমানে কোথায় গিয়েছিলেন তার সকল তথ্য মুছে ফেলা হয়েছে। ধারণা করা হয় সে সময় তিনি থাইল্যান্ড হয়ে পাকিস্তান সফর করেছিলেন। হামলার চূড়ান্ত পরিকল্পনা সম্পর্কে জানা যায়, ২০০৪ সালের ৯ আগস্ট তারেক রহমান সিঙ্গাপুর যান (টিকেট নং : ০৯-০৮-০৪ ২১৭ ৪৪০ ৮৩২ ১০৬১) এবং যাওয়ার আগে দু’জন গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে হামলা সম্পর্কে খালেদা জিয়াকে অবগত করার দায়িত্ব দিয়ে যান। তারেক ফিরে আসেন ২৩ বা ২৪ আগস্ট। ধারণা করা হয়, ২১ আগস্ট হামলার পরিপ্রেক্ষিতে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তারেক মালয়েশিয়ায় পাড়ি দিতেন।

আর্জেস-৮৪ গ্রেনেড

আর্জেস-৮৪ গ্রেনেড অস্ট্রিয়ায় এবং অস্ট্রিয়ার লাইসেন্সের ভিত্তিতে পাকিস্তানে তৈরি হয়। এ উপমহাদেশে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ছাড়া কেউ এ গ্রেনেড ব্যবহার করে না। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ব্যবহৃত গ্রেনেড হচ্ছে আর্জেস-৭২। অনেকে না জেনে কিংবা বিভ্রান্তি সৃষ্টির জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে আর্জেস-৮৪ গ্রেনেড ব্যবহারের কথা বলে থাকেন। এই আর্জেস-৮৪ গ্রেনেড ভারতে লস্করে তৈয়বা কর্তৃক ১৯৯৩ সালে মুম্বাই হামলায় ব্যবহার করা হয়েছিল। একই গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়েছিল সিলেট হামলায় ও শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডে।

ভয়াল ২১ আগস্ট

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী জনসভা ছিল। ২১ আগস্ট হঠাৎ করে আওয়ামী লীগের নির্ধারিত মুক্তাঙ্গনের সমাবেশের অনুমতি বাতিল করা হয়। এমতাবস্থায় ট্রাকের ওপর স্থাপিত একটি অস্থায়ী মঞ্চে সমাবেশ করা হয়। কোন সমাবেশ অনুষ্ঠানের আগে গোয়েন্দারা সমাবেশস্থলে অবস্থান নেন, তল্লাশি করেন; কিন্তু সেদিন কেউ আসেননি। শেখ হাসিনাসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ট্রাক-মঞ্চে ছিলেন; নেত্রী ভাষণ দেবেন। কোন নিরাপত্তা বেষ্টনী রাখার অনুমতি দেয়া হয়নি। ইউনিফর্মে বা সিভিল পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন সদস্যও মঞ্চের আশপাশে ছিলেন না। তারা পার্শ্ববর্তী কোন ভবনেও অবস্থান নেননি, যা অস্বাভাবিক। নিরাপত্তার জন্য গোয়েন্দা সংস্থা সব সময় ভিডিও ক্যামেরায় কর্মসূচী ধারণ করে। সেদিন কোন ক্যামেরা আনা হয়নি।

সেদিন পুলিশের অবস্থান ছিল সমাবেশ স্থলের অনেক দূরে। শেখ হাসিনা আনুমানিক ৫টা ২১ মিনিটে বক্তব্য দেয়া শুরু করতেই হামলা হয়। মানবঢাল তৈরি করে নেত্রীকে আগলে রাখেন তার নেতাকর্মীরা। হামলার পর পুলিশ জিডি পর্যন্ত নেয়নি। পরদিন লোক দেখানো মামলা করা হয়। বহু আহতকে ভর্তি করা হয়নি হাসপাতালে। হামলার সমস্ত আলামত নষ্ট করে ফেলা হয়। এমনকি সংসদে এ বিষয় উত্থাপন করা হলে স্পীকার আলোচনা বন্ধ করে দেন। জজ মিয়া নামে যে নাটক করা হয়েছে তা নিয়ে বিস্তারিত বলা নিষ্প্রয়োজন।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িত বিচ্ছিন্নতাবাদ, জঙ্গীবাদ ও উগ্রপন্থার শেকড়। এ উপমহাদেশে যেভাবে জঙ্গীবাদের প্রসার হয়েছিল সেটি বিবেচনা করলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ অবশ্যই জঙ্গীবাদ দমনে সবচেয়ে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছে এবং এই কৃতিত্ব শেখ হাসিনার। এ ধারাকে অব্যাহত রাখতে ২১ আগস্টের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা জরুরী। সুষ্ঠু রাজনীতির স্বার্থে এ হামলার নেপথ্যে কারা ভূমিকা পালন করেছে তাদের মুখোশ উন্মোচনও জরুরী।

মূল লেখার লিংক : এখানে ক্লিক করুন