Sat. May 28th, 2022

মুসলিম নাম রাখা যাবে না, রোজা রাখা যাবে না, টুপি পরা যাবে না, চাকরি দেয়া যাবে না – এমন কোনো পরিস্থিতির কথা যদি বলি, তাহলে হয়তো অনেকে ভাববেন মধ‍্যযুগের মুরস কমিউনিটির কথা বলছি। অনেকেরই ধারণার বাইরে যে, চীনের উইগর মুসলিমরা এমন নিপীড়নের শিকার হয়ে আসছে! আফগানিস্তান সহ ৯টি দেশের সীমান্তবর্তী শিনজিয়াং প্রদেশে চীনের যে সরকারি নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থা রয়েছে তা এ যুগের ঘটনা বলে বিশ্বাস করা কঠিন। শিংজিয়ান প্রদেশে মিলিটারি বেজ আরো প্রসারিত ও শক্তিশালী করা হচ্ছে এমন সংবাদ দেখে উইগরদের প্রসঙ্গ মাথায় এলো।

ভেবে দেখলাম পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি অপদার্থ আছে মুসলিমদের মধ্যে। সারা বিশ্বে সবচেয়ে নির্যাতনের শিকার মুসলিমরা। মিডল ইস্ট বেল্টেও নির্যাতনের শিকার এই মুসলিমরাই। তারা ১০০ জন মারলে ৯০ জনই দেখা যায় মুসলিম। বোনাস হিসেবে জঙ্গি খেতাব পায় ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ১০ জন মারার কারণে। সংখ‍্যায় একটু বেশি হলেই ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের উপর হামলা করতে জোশের অভাব হয় না – এই মর্মে সতর্কবাণী দেয় প্রায় সকল পশ্চিমা দেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

পলিটিকল ইসলামের নামে ক্ষমতা দখলের লক্ষ্য নিয়ে ইরানকে মডেল ভেবে মওদুদী, সাইদ কুতুব ও হাসান আল বান্নারা মুসলিমদের যে ক্ষতি করেছে তার ফলাফলগুলোর একটি হচ্ছে বার্মা থেকে বাংলাদেশে পুশইন, তাও আবার প্রেগন্যান্ট করে। তারপরও যার হাতে হাজার হাজার শরণার্থীর রক্তের দাগ, সেই ইরানি পাপেট এরদোগানকে নিয়ে গর্ব করে পোস্ট দেয় – আসিতেছে হুজুর, কাঁদিতেছে হুজুর পত্নী, নির্লজ্জ হয়ে বই লেখে – খলিফা এরদোগান!

মাত্র ৫০ বছরের ব‍্যবধানে ১৪০০ বছরের রীতি ভেঙ্গে ইসলামকে জঙ্গিবাদী হিসেবে নতুন একটি রূপে উপস্থাপন করেছে এই গুটিকয়েকের প্রভাবে প্রভাবিত পথভ্রষ্টরা। কেউ বলতে পারেন, মুসলিম শাসরা দখল করেছে, তাই খোমেনিদের দোষ কোথায়! এখানে আমাদের বিবেচনা করা উচিত, তখন প্রথাই ছিল দখলের। এতে হিন্দু মুসলিম সবাই যুগের প্রচলিত একই নিয়মে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। সবচেয়ে বড় কথা তারা কেউ ধর্মের নাম ব্যবহার করে মতবাদ বানায় নি। কিছু সময়ের জন্য ক্রুসেডররা যা করেছিল, তাকে মডেল ভেবে ইসলামের নামে আরো ভয়াবহভাবে বিষ ছড়িয়েছে মওদুদীরা।
যে প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করেছিলাম তা বলি। শিংজিয়ান প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ সম্ভাবনাময় একটি স্থান যা ১৯ শতক পর্যন্ত স্বাধীন ছিল। আফগানিস্তান, ভারত, পাকিস্তান, মঙ্গোলিয়া, কাজাকস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান ও রাশিয়া এ কয়েকটি দেশের সীমান্তবর্তী বলে এর ভৌগলিক গুরুত্ব অনেক। তাই রাশিয়ার সহযোগিতায় চীন সেটি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশের মর্যাদা দেয়।

শিংজিয়ান প্রদেশের মূল জনগোষ্ঠী উইগররা জাতিগতভাবে তুর্কি বংশোদ্ভূত এবং মুসলিম। অন‍্যদিকে চীনের অধিকাংশ জনগোষ্ঠী হচ্ছে হান। চীন ১৯১২ সালে প্রথম এটি দখল করে। ১৯৩৭ সালে যুদ্ধ হয় এবং ৪৯ সালে কমিউনিটিস্ট সরকার আসার পর সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। পাকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের মিত্রতার অভিজ্ঞতা, কাশ্মীর পরিস্থিতি, আফগানিস্তানে জঙ্গি উত্থান এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে উইগরদের যুদ্ধ – এসব বিবেচনা করে তাদের ধারণা হলো, মুসলিম অধ্যুষিত এ অঞ্চলটিতে স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলন হতে পারে। এমন হলে সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ এই প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন হবে। তারপর থেকে শুরু হয় চীনের হান জনগোষ্ঠীর বসতি স্থাপন প্রক্রিয়া। বিভিন্ন শিল্পায়নসহ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড হলেও উইগর মুসলিমদের চাকরী দেয়া হয় না, নিয়োগ হয় অন‍্য প্রদেশ থেকে আসা হানদের। ১৯৪৯ সালে যেখানে উইগর মুসলিম ছিল ৩২ লক্ষ এবং হান ১ লক্ষ, সেখানে বর্তমানে প্রায় আড়াই কোটি জনসংখ্যার ৪০% হান এবং ৪৭% উইগর মুসলিম।
শিংজিয়ান প্রদেশটি পুরোপুরি সিসিটিভি নিয়ন্ত্রিত। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমনভাবে উইগরদের পর্যবেক্ষণ করা হয় যেখানে তাদের ব‍্যক্তিগত জীবন নেই বললে ভুল হবে না। চলাচলে নিয়ন্ত্রণ, একত্রিত হতে নিষেধাজ্ঞা, টুপি পরা নিষিদ্ধ, নামাজ আদায়ে নিষেধাজ্ঞা না বসালেও রোজা রাখা নিষেধ, মুসলিম নাম রাখা নিষেধ এবং নির্দিষ্ট ক‍্যাটাগরি ছাড়া অন‍্যান‍্য খাতে কর্ম সংস্থানের সুযোগ নেই। বর্তমান বিশ্বে এমন কোনো অঞ্চলে আছে তা কল্পনা করাও কঠিন। কিছু মিডিয়ায় কালেভদ্রে দায়সারাভাবে এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলেও ফোকাস পায় না। মানবাধিকার সংগঠনগুলো সম্পূর্ণ নীরব। অন‍্যদিকে পাকিস্তানের অকৃত্রিম বন্ধুর বিরুদ্ধে কিছু বললে গুনাহ হতে পারে এমন ভেবে একটি শ্রেণী চুপ থাকে।
আমাদের কাছে উইগর জনগোষ্ঠীর মত মধ‍্যপ্রাচ‍্য ও সংলগ্ন অঞ্চলটির এমন অনেক সংবাদই পৌঁছে না। সবচেয়ে বড় কথা আমাদের মানবতাবোধ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, দ্বিপাক্ষিক বা ধর্মীয় সমীকরণের উপর নির্ভরশীল।