লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ – আল্লাহ ছাড়া কোনো প্রকৃত উপাস্য নেই : এই অর্থ গ্রহণে সুফি, দেওবন্দি, সালাফি, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত ইত্যাদি মুসলিমদের যত ভাগ-উপভাগ আছে, কেউ দ্বিমত করবে না। কিন্তু ব্রাদারহুডের মতো জঙ্গি সংগঠনগুলো ইলাহ’কে হুকুমদাতা বা হাকিম হিসেবে গ্রহণ করে। খারেজিরা আল হাকিম (হুকুমদাতা) দাবি করে প্রথম বিভেদ সৃষ্টি করলেও তারা কলেমা (kalima) বিকৃত করে নি। ১৪শ বছরে প্রথমবারের মতো সৈয়দ কুতুব কলেমা নিয়ে বিতর্ক তুললে প্রখ্যাত আলেম উসাইমীন বলেন, কলেমার অর্থ “Laa mabuda illallaah”, “Laa mabuda bihaqqin” or “laa mabuda bihaqqin illallaah” এর বাইরে কখনো, কোথাও পাওয়া যায় নি।
আল ইলাহঃ
ইলাহ শব্দের রুট আলাহা (alaha) যার অর্থ (abada) – উপাসনা। যেকোনো লুঘাত খুঁজলে ইলাহ শব্দের অর্থ পাবেন “আলাহা” অথবা “ইলাহুন” বা “আলাহা-ইয়া লাহু” যার অর্থ আবাদা। God হিসেবে আলাহা, এলোহা, এলোহিম ধরণের শব্দ বেদ ও বাইবেলেও আছে। সর্বত্রই এর অর্থ উপাসনা করা। আরবীতে “আল” শব্দটি নির্দিষ্টকরণের জন্য ব্যবহার হয়। যেমন: মদীনা মানে শহর, ঢাকাকেও মদীনা বলা যায়; কিন্তু যখন বলা হবে আল মদীনা – তখন প্রকৃত মদীনা শহরকে বোঝাবে। অনুরূপভাবে যার উপাসনা করা হয় তাকে ইলাহ বলে। প্রকৃত ইলাহকে আল্লাহ বলে যা এসেছে আল ইলাহ থেকে।
ইলাহ এর বহুবচন আলিহা। মক্কার অধিবাসীরা লাত, মানাত, উজ্জাকে আলিহা বা ইলাহুন বলতো।
ইলাহ = হুকুমদাতা বা আল হাকিম?ঃ
এই মতবাদের পক্ষে যুক্তি দেয়া হয়:
১. ইলাহ অর্থ মাবুদ হলে লা মাবুদা ইল্লাল্লাহ হওয়ার কথা। এটি যদি যুক্তি হয় তাহলে লা হাকিমা ইল্লাল্লাহ হলো না কেন?
২. মাবুদ বললে নাকি হুকুমদাতা/বিধান দাতা/মালিক হিসেবে অস্বীকার করা হয়। এই যুক্তি গ্রহণ করলে প্রশ্ন আসে – হুকুমদাতা বললে কি মাবুদ অস্বীকার করা হয়?
৩. প্রথমে ইবাদতের হুকুম দিয়েছেন তাই হুকুমদাতা হবে।
= প্রথমের বিষয় যদি আসে তাহলে প্রথমে সৃষ্টির প্রসঙ্গ আসবে। কলেমায় ইলাহ অর্থে খালিক নয় কেন?
৪. মক্কার অধিবাসীরা লাত, মানাত উজ্জাকে ইলাহ হিসেবে নিয়েছিল। এক আল্লাহর ইবাদত করতে বলায় তারা বলেছে “সে কি সব ইলাহকে এক ইলাহ এ পরিণত করেছে?”
কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, তারা তাদেরকে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করেছে যারা জবাবও দিতে পারে না।
ইলাহ যদি মাবুদ না হয়ে হুকুমদাতা হয় তাহলে বিষয়টি হাস্যকর হয় নয় কি? লাত কোন সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী ছিল? মানাত কোথাকার বাদশা ছিল? উজ্জা কি হুকুম দিয়েছিল?
কেন মাবুদ?
আল্লাহ একমাত্র অলি – এটি কোরআনেই রয়েছে। কিন্তু মানুষকেও অলি বলা হয়। আল্লাহর জন্য ব্যবহৃত শব্দ মাওলা, আমাদের সমাজে মানুষের জন্য ব্যবহৃত হয়। আল্লাহর গুণাবলীর মধ্যে এক্সক্লুসিভ গুণাবলী অন্য কারো জন্য ব্যবহার হয় না। যেমন রব, মাবুদ, খালিক। সুতরাং ইলাহ এর অর্থ এক্সক্লুসিভ হওয়া স্বাভাবিক।
উপাসনা বা ইবাদত এসেছে আবাদা বা আবুদু থেকে। যার ইবাদত করা হয় তিনি মাবুদ। যে ইবাদত করে সে আব্দ। আব্দুল্লাহ শব্দটি ইসলাম পূর্ববর্তী সময় থেকেই প্রচলিত।
সকল নবী রাসুলগণ আল্লাহর একত্ববাদের বাণী নিয়ে এসেছেন এবং তা ছিল ইবাদত কেন্দ্রিক। মুসা (আঃ) ফেরাউনকে পরাজিত করেও ক্ষমতা গ্রহণ করেন নি। ইউসুফ ও দাউদ (আঃ) এর মতো সবাই বাদশাহি করেন নি। আল্লাহ তাঁদেরকে “মুলুকিয়াত” দান করেছিলেন। সোলায়মান (আঃ) “মুলুকান” পাওয়ার দোয়া করেছিলেন। মুলুকিয়াত দেয়া হলে সার্বভৌমত্ব বা অথরিটিও দেয়া হয়। রাজ্যের আইন ও যাবতীয় ফয়সালা তিনিই করেন।
সার্বভৌমত্ব যখন আল্লাহর ক্ষেত্রে হয় তখন তা প্রতিষ্ঠার বিষয় নয়, বরং তা বিশ্বাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কেউ বিশ্বাস না করলে আল্লাহর সার্বভৌমত্বে পরিবর্তন হয় না।
মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্যই ইবাদত। মক্কাবাসীরা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব তথা সর্বময় ক্ষমতায় বিশ্বাসী ছিল। তাদের উপর কোনো আইন বা বিধিবিধান চাপিয়ে দেয়া হয় নি। এক আল্লাহর ইবাদত ও রাসুল হিসেবে স্বীকৃতি ছাড়া আর কোনো শর্ত দিয়েও আহ্বান করা হয় নি। কিন্তু তাদের আপত্তি ছিল আল্লাহর একক ইবাদতে।
কোরআনে সুরা তওবার ৩১ নং আয়াতে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর অর্থ সুস্পষ্ট রয়েছে – তারা আদিষ্ট ছিল একমাত্র মাবুদের এবাদতের জন্য – তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই।
কোরআনে আল্লাহর পক্ষ থেকে যে খিলাফত বা বাদশাহি প্রদানের কথা বলা হয়েছে তার শর্তও উবুদুল্লাহ।
কলেমা ইসলামের স্বীকৃতির পাশাপাশি একটি জিকির তথা ইবাদত। তাই ইলাহ মানে মাবুদ – এতে জঙ্গি বা বাতিল ছাড়া কারো আপত্তি থাকার কথা নয়।
উল্লেখ্য, ইলাহ অর্থে হুকুমের কথা বলার সময় কলেমার বিকৃতিকারীরা “ইনিল হুকমু ইল্লা লিল্লাহ” – হুকুম শুধু আল্লাহর বলে থাকে। এই আয়াতের দোহাই দিয়ে হযরত আলীকে কাফের ঘোষণা দিয়েছিল খারেজিরা। ইবনে আব্বাস সুরা নিসা ও বাকারা থেকে প্রমাণ দিয়েছিলেন মানুষও আইনগত ফয়সালা দিতে পারে।
কোনো নবী রাসুল এসে এই দাওয়াত দেন নি – তুমি শুধু এক আল্লাহর হুকুম পালন করো। হুকুম পালন, আনুগত্য, গোলামী এগুলো সবই ইবাদতের ফলাফল। মানুষ ইবাদত করলেই হুকুম পালনের ইচ্ছা ও আনুগত্য সৃষ্টি হয়। মাবুদ হিসেবে গ্রহণ না করলে কি হুকুম পালন করবে? কেউ যখন গুনাহ করে তখন সে আল্লাহর হুকুম পালন করে না, তবু আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয় না। কিন্তু যখন ইবাদতে অংশীদার করা হয় তখন ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।
যারা হুকুমের কথা বলে তারা “আতিউল্লাহ ওয়া আতিউর রাসুল ওয়া উলিল আমর মিনকুম” বলে রাসুল ও নেতার আনুগত্যের কথা বলে, রাসুল ও ইমামের হুকুম মানার কথা বলে। আরবী ব্যাকরণ জানা একজন কিশোরও এই আয়াত পড়ে বলতে পারে, আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য নিঃশর্ত হলেও নেতার আনুগত্য নিঃশর্ত নয়। কিন্তু জঙ্গিরা নেতার হুকুমকেও নিঃশর্ত দাবি করে ইসলামের নামে জঙ্গিবাদী এবং/অথবা শয়তানের দল গঠন করে। অথচ মুখে বলে হুকুম শুধু আল্লাহর!
ইলাহ যখন আল্লাহ, তখন তিনি শুধু মাবুদই নয়, হুকুমদাতা সহ আরও যত সিফাত আছে সবই প্রযোজ্য। যেখানে যে শব্দ প্রয়োগের সেখানে সেটিই হবে। আল্লাহ রহমান, তাই বলে খালিক অর্থ রহমান নয়। কলেমার ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়।
কলেমাকে বিকৃত করার মূল কারণ : যাদের ইসলাম সম্পর্কে তেমন ধারণা নেই, তাদেরকে হুকুমদাতা শব্দের ফাঁদে ফেলে কথিত হিজবুল্লাহ বা আল্লাহর দল গঠন করা। এসব দলে জেহাদকে সশস্ত্র যুদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। জিহাদ মানে যে যুদ্ধ নয় এবং জিহাদ-এ-ফি সাফিলিল্লাহর পাঁচটি শ্রেণীর একটি যে সশস্ত্র যুদ্ধ, তা তাদের জানারও সুযোগ হয় না।
কলেমায় হুকুমত কায়েমের শিক্ষা পেলে ইসলামের মূল বিষয়বস্তু তথা ইবাদত গৌন হয়ে যায়। ফলে পথভ্রষ্টদের ধোঁকায় পড়ে অনেকে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়। জাহান্নামের পথ বেছে নিয়ে সেটাকেই জান্নাতের পথ মনে করে।