Sat. May 28th, 2022
আবদুল্লাহ হারুন জুয়েল
বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের হৃদয়ে প্রোথিত শোকগাথার নাম শেখ রাসেল। স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বঙ্গবন্ধু ভবনে জন্মগ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সবার আদরের শেখ রাসেল ৪র্থ শ্রেণীর ছাত্রাবস্থায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।
শেখ রাসেলের জন্ম ছিল বঙ্গবন্ধু পরিবারে আনন্দের এক ভিন্ন মাত্রা। সকলেই ব্যস্ত থাকতেন পরিবারের মধ্যমণি রাসেলের পরিচর্যায়। অন্যদিকে বন্দী হয়ে দীর্ঘদিন কারাগারে থাকায় ও রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে শেখ রাসেলকে খুব বেশি কাছে পাননি বঙ্গবন্ধু। জন্মের সময়ও বঙ্গবন্ধু ছিলেন চট্টগ্রামের এক রাজনৈতিক সভায়। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকেই আব্বা বলে সম্বোধন করতেন রাসেল। তবে রাসেলের প্রতি বঙ্গবন্ধুর যে গভীর ভালোবাসা ছিল তা ‘কারাগারের রোজনামচা’ বইয়ে অসংখ্যবার তুলে ধরেছেন। অনুতাপ প্রকাশ করেছেন তাকে সময় না দেয়ার কারণে।
আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘কারাগারের রোজনামচা’য় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন : ‘৮ ফেব্রুয়ারি ২ বৎসরের ছেলেটা এসে বলে, আব্বা বালি চলো।’
কী উত্তর ওকে আমি দিব। ওকে ভোলাতে চেষ্টা করলাম ও তো বোঝে না আমি কারাবন্দী। ওকে বললাম, ‘তোমার মার বাড়ি তুমি যাও। আমি আমার বাড়ি থাকি। আবার আমাকে দেখতে এসো।’
ও কি বুঝতে চায়! কি করে নিয়ে যাবে এই ছোট্ট ছেলেটা, ওর দুর্বল হাত দিয়ে মুক্ত করে এই পাষাণ প্রাচীর থেকে!
দুঃখ আমার লেগেছে। শত হলেও আমি তো মানুষ আর ওর জন্মদাতা। অন্য ছেলেমেয়েরা বুঝতে শিখেছে। কিন্তু রাসেল এখনও বুঝতে শিখে নাই। তাই মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে যেতে চায় বাড়িতে।
শেখ রাসেল কথা বলতে শিখেছেন এমন সময়ই রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হন। প্রয়াত সাংসদ ও সাংবাদিক বেবি মওদুদের লেখায় রাসেলের কৌতূহল জানা যায় :
‘মা, আব্বার নাকি ফাঁসি হবে। ফাঁসি কি মা?’
মা বলেন, ‘কে বলেছে তোমাকে এ কথা?’
রাসেল উত্তর দেয়, ‘সেদিন কাকা আর দুলাভাই, কামাল ভাই বলছিল, আমি শুনেছি মা।’
জানা যায়, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় ‘জয় বাংলা’ বলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন এবং বাবার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে উক্তি করতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও শেখ রাসেল বাসায় উচ্চস্বরে জয় বাংলা স্লোগান দিতেন। তার রাজনৈতিক প্রতিভার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, একটি কালো বড় পিঁপড়া কামড় দেয়ার পর থেকে কালো বড় পিঁপড়া দেখলে বলতেন ‘ভুট্টো’!
সে সময়ের শিশুরা সাধারণত ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও রাসেল ছিলেন ব্যতিক্রম। কেউ যখন রাসেলকে জিজ্ঞেস করতো বড় হয়ে তুমি কি হবে? রাসেল বলতেন, ‘আর্মি অফিসার হবো।’ তবে অনুকরণীয় ব্যক্তি হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন বাবাকেই। বঙ্গবন্ধু যে পোশাক পরতেন, রাসেলও তা-ই পছন্দ করতেন।
রাসেল যে বঙ্গবন্ধুর হৃদয়ের বিশেষ স্থানে ছিলেন তা বিশ্ববাসীরও অজানা ছিল না। তাই মুক্তিযুদ্ধের সময় সহায়তাকারী দেশ জাপান, বঙ্গবন্ধুর গোটা পরিবারকেই জাপান সফরের আমন্ত্রণ জানানোর সময় শেখ রাসেলের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছিল। এ সময় শেখ রেহানা, রাসেলের সঙ্গে সফরে গিয়েছিলেন।
শিশু রাসেলের বাবার পর প্রিয় সঙ্গী ছিলেন তার হাসু-পা, আমাদের জননেত্রী শেখ হাসিনা। তার দিন কাটতো হাসু-পার সাথে, হাসু-পার চুলের বেণি ধরে খেলতেন, হাঁটাও শিখেছিলেন হাসু-পা’র হাত ধরেই এবং তা একদিনেই। জীবনের শেষ আকুতিও ছিল হাসু-পাকে নিয়ে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বর সড়কের বাড়িতে যখন নির্মম হত্যাযজ্ঞ চলে তখন রাসেল খুনিদের বলেছিলেন, ‘আমি মায়ের কাছে যাব।’ মায়ের লাশ দেখার পর অশ্রুসিক্ত নয়নে মিনতি জানিয়েছিলেন ‘আমাকে হাসু আপার কাছে পাঠিয়ে দিন।’ জন্ডিস আক্রান্ত হয়ে অসুস্থতার কারণে হাসু-পা’র সাথে জার্মানি যাওয়া হয়নি রাসেলের। ঘাতকের বুলেট কেড়ে নেয় শিশু রাসেলের প্রাণ! কিন্তু রাসেলই আমাদের কাছে ফিরে আসেন জাগরণের চেতনা হয়ে।
’৭৫ পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু, তার পরিবার, এমনকি শেখ রাসেলের স্মরণও নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু বাংলার মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে শেখ রাসেলের শোকগাথা। তিনি স্থান পেয়েছেন আমাদের সাহিত্যে, সংস্কৃতিতে ও চেতনায়। দেশের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে শেখ রাসেল হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের এক অবিস্মরণীয় অনুপ্রেরণার নাম।
মূল লেখার সূত্র: এখানে ক্লিক করুন